মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ১৯ অক্টোবর ২০১৯

ইতিহাস

বুড়িগঙ্গা নদীতীরে অবস্থিত প্রায় সাতশত বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বন্দর নগরী ঢাকা। মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ১৬০৮ সালে ঢাকায় রাজধানী স্থাপিত হলে বিশ্বব্যাপী এ নগরীর মর্যাদা ও গুরুত্ব বেড়ে যায়। বাংলার সুবেদার ইসলাম খান ঢাকার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। গড়ে ওঠে গরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অট্রালিকা। নগরবাসীরকল্যাণে মোঘল সুবেদারগণ উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ করেন। এসময় তারা চকবাজার থেকে সূত্রাপুর লোহারপুল পর্যন্ত প্রায় ৪ কি. মি. দীর্ঘ ইটের রাস্তাও নির্মাণ করেন। এমনকী শৌর্যবীর্যের দিক দিয়ে ঢাকা পৃথিবীর ১২তম অবস্থানে ছিল। ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলার শাসনভার গ্রহণ করার পর ঢাকা নগরীর উন্নয়ন ব্যহত হয়। কোম্পানী নগরবাসীর কোন সুযোগ সুবিধা না করে লুণ্ঠনে ব্যস্ত থাকে। এভাবেই চরম অব্যবস্থাপনার অতিবাহিত হয় কিছু সময়।

মোঘল আমলে শহরের প্রশাসনিক কাজকর্ম যেমন: শান্তিরক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি ও নৈতিক মানরক্ষা ইত্যাদি দায়িত্ব ছিল সরকারের। ১৭৭২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীল পুনর্বিন্যাসের ফলে শহরের প্রশাসনের কর্মকর্তা মনোনীত হন একজন ইউরোপীয় ম্যাজিস্ট্রেট। ১৮১৩ সালে ম্যাজিস্ট্রেট জেমস ওল্ডহ্যামের অনুরোধ  সরকার গঠন করে ‘কমিটি ফর দি ইমপ্রুভমেন্ট অব দি সিটি অব ঢাকা অ্যান্ড আদার প্লেসেস ইমিডিয়েটলি অ্যাডজাস্ট টু দি সিটি।

১৮২৩ সালে নগর উন্নয়নে গঠন করা হয় কমিটি অব ইমপ্রূভমন্ট। এই কমিটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কাজ করে। ১৮২৯ সালের নভেম্বররে কমিটি বিলুপ্ত সাধিত হয়। এর পরিবর্তে সরকার ১৯৪০ সালে ‘ঢাকা কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠন করেনি। ঢাকা পৌরমিটি ১৮৪০ থেকে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কী কী কাজ করেছিলেন জানা যায়নি।

অবশেষে ১৮৬৪ সালের ১ আগষ্ট ঢাকা পুরসভা স্থাপিত হয়। ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কমিটি অ্যাক্ট বলে আগস্ট মাসে স্থাপন করা হয় ‘ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কমিটি’। ১৯৬৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকার বলে মিউনিসিপ্যালিটির সভাপতি ছিলেন। ভাইস চেয়ারম্যান নিয়োগ করতেন লেপটেন্যান্ট গভর্নর, ডিবিশনাল কমিশনার, ম্যাজিস্ট্রেট, নির্বাহী প্রকৌশলী ও সিভিল সার্জন ছিলেন পদাধিকার বলে সভাপতি। কমিশনারের সংখ্যা ছিল ১৪ থেকে ২৩ পর্যন্ত। জেল ম্যাজিস্ট্রেট মি, স্কিনার এবং ঢাকা কলেজের শিক্ষক জর্জ বিলার্ট ছিলেন যথাক্রমে পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান। প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন যথাক্রমে জনাব আনন্দ চন্দ্র রায়চৌধুরী ও জনাব খান আব্দুল্লাহ।

১৮৮০ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে ঢাকার নবাব ও অন্যান্য ধনাঢ্য ব্যক্তির সহায়তার ঢাকা পাওয়া পরিশ্রুত পানি ও বৈদ্যুতিক আলো। পানি ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে পৌরসভা অগ্রাধিকার দিয়েছিল অভিজ্ঞতা এলাকাগুলোতে। পৌরসভার পাশাপাশি ছিল নবাবদের নিয়ন্ত্রিত পঞ্চায়েত। মহল্লার পঞ্চায়েত প্রধান নির্বাচিত হত সমাজের বিত্তবানরা। তাদের প্রধান কাজ ছিল সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

ঢাকা পৌরসভার জন্যে নতুন অ্যাক্ট ১৯৩২ সালে প্রবর্তিত হয়। এ অ্যাক্ট দেশ বিভাগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান অর্জনের সাথে সাথে ঢাকা শহরকে করা হলো তদানিন্তন পূর্বে পাকিস্তানের রাজধানী। প্রাদেশিক রাজধানীর পদমর্যাদা পাওয়ার পর থেকেই ঢাকার গুরুত্ব বেড়ে যায়। তাই এ শহরকে পুনবিন্যাসের প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে সরকার ঢাকা পৌরসভা বাতিল ঘোষণা করে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত পৌরসভায় কোন নির্বাচন হয়নি। এ সময়ে সরকার মনোনীত ব্যক্তিবর্গই ঢাকা পৌরসভার কাজ পরিচালনা করতেন। ১৯৬০ সালে সরকার মিউনিসিপ্যাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অর্ডিন্যান্স জারি করেন। এই অর্ডিন্যান্স বলে নির্বাচিত চেয়ারম্যানের স্থলে সরকারি পদস্থ কর্মকর্তাকে মনোনয়নদানের আদেশ করা হয়। তবে ভাইস চেয়ারম্যান পদটি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে থেকেই নির্বাচনের বিধি বলবৎ থাকে।

ঢাকা পৌরসভা পূর্বে সাতটি ওয়ার্ডে বিভক্ত ছিল। পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ সালে সরকার এই পৌরসভার ২৫টি ইননিয়নকে ৩০টি ইউনিয়নে বিভক্ত করে এবং ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের ঢাকা পৌরসভার সদস্য পদ দান করে। তাছাড়া বেশ কিছুসংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তিকে মনোনীত কমিশনার বা সদস্য করা হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকা শহরের গুরুত্ব অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা নগরীকে ৫০টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকা পৌরসভা গঠন করা হয়।

১৯৭৮ সালে ঢাকা পৌরসভাকে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয় পৌরসভার চেয়ারম্যান ঢাকা মিউিনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মেয়র নামে অবিহিত হয়। এটা ছিল ঢাকা নগরবাসীদের বহুদিনের আশা আকাঙ্খার বাস্তব রূপায়ণ। এই সময় ৫০ জন নির্বাচিত কমিশনারসহ ৫ (পাঁচ) জন মনোনীত কমিশনার থাকার বিধান ছিল। ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত তৎকালীন মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮২ সালে মিরপুর এবং গুলশাল পৌরসভাকে বিলুপ্ত করে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সাথে একীভূক্ত করা হলে এর আয়তন ও দায়িত্ব বৃদ্ধি পায় এবং ঢাকা নগরী ঢাকা মহানগরীতে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে ওয়ার্ডের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬টি।

১৯৮৩ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের আয়তন, জনসংখ্যা ও দায়িত্ব ক্রমশয়ে বৃদ্ধিজনিত কারণে ওয়ার্ডের সংখ্যা ৭৫টিতে উন্নীত হয়।

১৯৯০ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের নাম পরিবর্তন করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে নামকরণ করা হয় এবং জনসেবার মান ও কার্যক্রম উন্নত ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ঢাকা মহানগরীকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ১০টি আঞ্চলিক কার্যাালয়ে বিভক্ত করা হয়।

১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডকে পুনরায় ৯০টিতে উন্নীত করে গনতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের লক্ষ্যে এই প্রথম জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান হিসেবে জনাব মোহাম্মদ হানিফ মেয়র নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে কর্পোরেশনের ৯০ জন ওয়ার্ড কমিশনারও জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৯০ জন নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার ছাড়াও ১৮ জন মনোনীত মহিলা কমিশনারের বিধান ছিল ২০০১ সালে সরকারি এক গেজেটে সংরক্ষিত আসনে মহিলা কমিশনারের সংখ্যা ১৮ থেকে বাড়িয়ে ৩০-এ উন্নীত করা হয়। ২০০২ সালে জনাব সাদেক হোসেন খোকা এমপি নগরবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত মেয়র হন এবং ৩০টি মহিলা সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচিত হয়।

১৯৪৭ সালে ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল মাত্র ২ লক্ষ ৯৫ হাজার। ১৯৫১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার ৯২৮ জনে। এরপর ১৯৬১ সালে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার ১৪৩ জন, ১৯৭৪ সালে ১৬ লক্ষ ৪৯৫ জন, ১৯৮১ সালে ৩৪ লক্ষ ৪০ হাজার ১৪৭ জন, ১৯৯১ সালে ৬৮ লক্ষ ৪৪ হাজার ১৩১ জন এবং ২০০১ সালে তা উন্নীত হয়  ১ কোটি ৭ লক্ষ ১২ হাজার ২০৬ জন। বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ।

নগরবাসীর সেবা সহজলভ্য করার বৃহত্তর স্বার্থে ১৯১১ সালের ৩০ নভেম্বর সরকার এক অধ্যাদেশ বলে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুইভাগে বিভক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নামে দুইটি সেনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু আইনী জটিলতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সালের ২৮ মার্চ মেয়র পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত জনাব মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মেয়র পদে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন । ৬ মে ২০১৫ সালে নবনির্বাচিত মাননীয় মেয়র শপথ গ্রহণ করেন।


Share with :

Facebook Facebook